আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতিক
বাংলাদেশের আপোষহীন নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ৩০শে ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনার নানা রকম অত্যাচার নির্যাতনে তাঁর স্বাস্থ্যের আরো বেশি অবনতি ঘটে। কিডনি, হৃদরোগ এবং নতুন করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত প্রায় এক মাস যাবত তিনি ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এদিকে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তী সরকার। এছাড়া বুধবার খালেদা জিয়ার জানাজা উপলক্ষ্যে সরকার একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ এবং আপোষহীন মানসিকতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকজন নারী নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তাঁদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য নাম। তিনি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের নাম, এক আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চরিত্র। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও ব্যক্তিগত দুর্ভোগের মধ্যেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন—যা তাঁকে ইতিহাসে আলাদা উচ্চতায় স্থান দিয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, তবে পূর্বপরিকল্পিতও ছিল না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে তিনি হঠাৎ করেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর তিনি গভীর শোক ও নিঃসঙ্গতার মধ্যেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় বিএনপির নেতৃত্ব নেওয়া ছিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত, কিন্তু দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক যাত্রা।
আশির দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ। তখনকার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি আপোষহীন অবস্থান নেন। বারবার গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েও তিনি রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি যে আন্দোলন গড়ে তোলে, তা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন—যা ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল ছিল বহুমাত্রিক। তাঁর নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা জোরদার হয় এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে তাঁর সরকারের নানা পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে আলোচিত হয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব ও বহুদলীয় গণতন্ত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন—বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল ভৌগোলিক নয়, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিদেশি প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জাতীয় স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান এবং জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি কখনোই আপস করেননি। এই আপোষহীনতাই তাঁকে একদিকে জনপ্রিয় করেছে, অন্যদিকে তাঁকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত করেছে।
২০০১ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে কাজ করে। দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। যদিও তাঁর শাসনামল নিয়ে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে, তবুও তাঁর নেতৃত্বের প্রভাব ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ক্ষমতা হারানোর পর বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাজনৈতিক মামলার মুখোমুখি হন, কারাবরণ করেন এবং গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও রাজনীতি থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করেননি। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি দলের নেতাকর্মীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থেকেছেন। তাঁর এই ধৈর্য ও সহনশীলতা তাঁকে একজন মানবিক ও দৃঢ়চেতা নেত্রী হিসেবে আরও উজ্জ্বল করেছে।
একজন নারী হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন—নারী নেতৃত্ব কেবল প্রতীকী নয়, কার্যকর ও শক্তিশালীও হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের যে ধারাটি গড়ে উঠেছে, সেখানে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইতিহাসের বিচারে বেগম খালেদা জিয়া হবেন এক বিতর্কিত কিন্তু অপরিহার্য চরিত্র। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আন্দোলন ও সংগ্রাম নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল অবস্থান প্রশ্নাতীত। তিনি এমন এক সময় রাজনীতির হাল ধরেছিলেন, যখন দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ছিল। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি সাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আজও বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শক্তিশালী প্রতীক। তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারপার্সন নন, তিনি গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে এক প্রতিরোধের নাম। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করবে, তখন তাঁর নাম আসবে আপোষহীন নেতৃত্ব, দীর্ঘ সংগ্রাম ও দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি হিসেবে।
পরিশেষে বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক নেত্রী, যাঁর জীবন রাজনীতির সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। তাঁর অবদান, ত্যাগ ও সংগ্রাম দেশ ও জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—বাংলাদেশের আপোষহীন নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
আরো পড়ুন
হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
জানুন কে হবেন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রপতির থাকা না–থাকার প্রশ্নে উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা


0 মন্তব্যসমূহ